Health programme in India
Health programme in India
ভারতে জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি (National Malaria Eradication Programme – NMEP): একটি উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারতে সংক্রামক ব্যাধিগুলির মধ্যে ম্যালেরিয়া ছিল সর্বাধিক প্রাণঘাতী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার একাধিক কেন্দ্রীয় স্পন্সরড স্বাস্থ্য প্রকল্প (Centrally Sponsored Health Schemes) গ্রহণ করে, যার মধ্যে জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল কর্মসূচি অন্যতম। এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা ম্যালেরিয়ার রোগতত্ত্ব, ভোর কমিটির ঐতিহাসিক সুপারিশ, NMEP-এর উত্থান-পতন, ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করব।

সূচিপত্র (Table of Contents)
- ১. ভারতে জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
- ২. ম্যালেরিয়া রোগের কারণ, বিস্তার ও ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
- ৩. ভারতে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক মাইলফলক (Timeline)
- ৪. ভোর কমিটি (১৯৪৬) ও জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NMCP, ১৯৫৩)
- ৫. জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি (NMEP, ১৯৫৮) ও এর পুনরুত্থানের কারণ
- ৬. আরবান ম্যালেরিয়া স্কিম (১৯৭১) ও মডিফাইড প্ল্যান অফ অপারেশন (MPO, ১৯৭৭)
- ৭. ম্যালেরিয়া অ্যাকশন প্রোগ্রাম (MAP, ১৯৯৫) ও বর্ধিত ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প (EMCP)
- ৮. জাতীয় ভেক্টর বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NVBDCP) ও এলিমিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক
- ৯. আধুনিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রোটোকল (Diagnosis & Treatment)
- ১০. মশক নিধন ও ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ কৌশল (Vector Management)
- ১১. সাধারণ প্রশ্নোত্তর (Frequently Asked Questions – FAQs)
১. ভারতে জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
যেকোনো কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে তার নাগরিকদের অকালমৃত্যু (Mortality) এবং অসুস্থতার হার (Morbidity) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা। ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে জাতীয় স্তরে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কেন্দ্র-স্পন্সরড স্কিম চালু করেছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান কর্মসূচিগুলো হলো:
- জাতীয় ভেক্টর বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NVBDCP): ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর, জাপানিজ এনসেফালাইটিস এবং ফাইলেরিয়া প্রতিরোধে একক ছাতার তলায় পরিচালিত প্রকল্প।
- জাতীয় যক্ষ্মা দূরীকরণ কর্মসূচি (NTEP): ডটস (DOTS) পদ্ধতির মাধ্যমে টিবি রোগ নিয়ন্ত্রণ।
- জাতীয় কুষ্ঠ নির্মূল কর্মসূচি (NLEP): মাল্টি-ড্রাগ থেরাপির (MDT) মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগ নির্মূল।
- জাতীয় এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NACP): এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ ও আক্রান্তদের সামাজিক পুনর্বাসন।
- সার্বজনীন টিকাকরণ কর্মসূচি (UIP / Mission Indradhanush): শিশুদের প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা প্রদান।
২. ম্যালেরিয়া রোগের কারণ, বিস্তার ও ক্লিনিক্যাল লক্ষণ
ম্যালেরিয়া হলো একটি প্রোটোজোয়া বা এককোষী আদ্যপ্রাণীঘটিত সংক্রামক রোগ, যা প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) গণের পরজীবীর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। সংক্রামিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস (Anopheles) মশার দংশনের মাধ্যমে এই পরজীবী মানবদেহে প্রবেশ করে।
ম্যালেরিয়ার প্রধান চারটি পরজীবী প্রজাতি:
- প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স (Plasmodium vivax): ভারতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (মোট সংক্রমণের প্রায় ৫০–৬০%)। এতে বারবার জ্বর ফিরে আসার (Relapse) প্রবণতা থাকে।
- প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম (Plasmodium falciparum): সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী প্রজাতি। এটি ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া, সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া ও রোগীর কিডনি বিকল করে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
- প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরি (Plasmodium malariae): কোয়ার্টান ম্যালেরিয়া সৃষ্টি করে (প্রতি ৭২ ঘণ্টা অন্তর জ্বর)।
- প্লাজমোডিয়াম ওভেল (Plasmodium ovale): তুলনামূলকভাবে বিরল প্রজাতি।
ক্লাসিক্যাল লক্ষণ ও জ্বরের তিনটি পর্যায় (Stages of Paroxysm):
| পর্যায় (Stage) | স্থায়িত্বকাল | প্রধান শারীরিক উপসর্গ |
|---|---|---|
| ১. শীতাবস্থা (Cold Stage) | ১৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা | রোগী প্রচণ্ড কাঁপুনি দিয়ে শীত অনুভব করে। দাঁতে দাঁত লাগে, লেপ-কম্বল দিয়েও শীত কমে না। চামড়া ফ্যাকাশে হয় ও দ্রুত নাড়িস্পন্দন দেখা দেয়। |
| ২. উত্তাপাবস্থা (Hot Stage) | ২ থেকে ৬ ঘণ্টা | প্রচণ্ড জ্বর আসে (তাপমাত্রা ১০৩°–১০৫°F বা তার বেশি হতে পারে)। প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বমি ভাব, তীব্র পিপাসা এবং শরীর জ্বালাপোড়া করে। |
| ৩. ঘর্মাবস্থা (Sweating Stage) | ২ থেকে ৪ ঘণ্টা | রোগীর শরীর ঘেমে স্নান হয়ে যায়, দেহের তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিকের নিচে নেমে আসে এবং রোগী চরম ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। |
৩. ভারতে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক মাইলফলক
ভারতে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস এক শতাব্দীর দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। নিচে এর প্রধান মাইলফলকগুলি পর্যায়ক্রমে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| সাল / বছর | উদ্যোগ / কর্মসূচির নাম | মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য |
|---|---|---|
| ১৯৪৬ | ভোর কমিটি রিপোর্ট (Bhore Committee) | স্বাধীন ভারতে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রথম আনুষ্ঠানিক সুপারিশ। |
| ১৯৫৩ | জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NMCP) | ডিডিটি (DDT) স্প্রে ও চিকিৎসার মাধ্যমে সংক্রমণের মাত্রা কমানোর প্রথম সর্বভারতীয় প্রকল্প। |
| ১৯৫৮ | জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি (NMEP) | ৭ থেকে ৯ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ দেশ থেকে ম্যালেরিয়া মূল্যোৎপাটন করার পরিকল্পনা। |
| ১৯৭১ | আরবান ম্যালেরিয়া স্কিম (UMS) | শহরাঞ্চলের নির্মাণ ও ঘনবসতিতে মশার প্রজনন রোধে বিশেষ নজরদারি। |
| ১৯৭৭ | মডিফাইড প্ল্যান অফ অপারেশন (MPO) | ম্যালেরিয়ার পুনরুত্থান রুখতে মৃত্যু প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধ সরবরাহ জোরদার। |
| ১৯৯৫ | ম্যালেরিয়া অ্যাকশন প্রোগ্রাম (MAP) | উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও উপজাতীয় এলাকার জন্য নির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন। |
| ১৯৯৭ | এনহ্যান্সড ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল প্রজেক্ট (EMCP) | বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১০০টি উপজাতীয় ও দূরবর্তী জেলায় নিবিড় নজরদারি। |
| ২০০৩-০৪ | NVBDCP গঠন | ভেক্টর-বাহিত সমস্ত রোগকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় আনা। |
| ২০১৬-৩০ | ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক (NFME) | ২০২৭ সালের মধ্যে সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্য। |
৪. ভোর কমিটি (১৯৪৬) ও জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NMCP, ১৯৫৩)
ভোর কমিটির প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পূর্বে ভারতে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে সাত কোটি (৭৫ মিলিয়ন) মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতো এবং বার্ষিক প্রায় ৮ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটত। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট অনুধাবন করে ১৯৪৬ সালে গঠিত স্যার জোসেফ ভোর কমিটি (Bhore Committee) দেশব্যাপী সমন্বিত ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের দৃঢ় সুপারিশ করে।
NMCP চালুকরণ (এপ্রিল ১৯৫৩): ভারত সরকার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (National Malaria Control Programme) চালু করে। এর মূল কৌশল ছিল:
- ইনডোর রেসিডুয়াল স্প্রে (IRS): মানুষের বসতবাড়ি ও গোয়ালঘরে ডিডিটি (DDT) কীটনাশকের নিয়মিত স্প্রে করা।
- নজরদারি দল গঠন: এলাকাভিত্তিক জরিপ চালিয়ে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ পর্যবেক্ষণ করা।
- ওষুধ সরবরাহ: আক্রান্ত রোগীদের বিনামূল্যে ক্লোরোকুইন জাতীয় অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ প্রদান।
এর ফলে ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
৫. জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি (NMEP, ১৯৫৮) ও এর বিপর্যয়ের কারণ
NMCP-এর অভাবনীয় সাফল্যের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আহ্বানে ভারত সরকার ১৯৫৮ সালে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি (NMEP) চালু করে। লক্ষ্য ছিল আগামী ৭ থেকে ৯ বছরের মধ্যে দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করা। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং ১৯৬৫ সালে ভারতে ম্যালেরিয়ায় একটিও মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকে এই কর্মসূচি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং ১৯৭৬ সালে আক্রান্তের সংখ্যা পুনরায় ৬৪ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।
কর্মসূচি ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণসমূহ:
- প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সংকট (Administrative Failures): কীটনাশক ও ওষুধের তীব্র ঘাটতি, পর্যাপ্ত ফিল্ড ওয়ার্কারের অভাব এবং আন্তর্জাতিক অনুদান হ্রাস পাওয়া।
- প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা (Technical Failures): অ্যানোফিলিস মশা প্রচলিত ডিডিটি এবং বিএইচসি (BHC) কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Insecticide Resistance) গড়ে তোলে। পাশাপাশি P. falciparum পরজীবী ক্লোরোকুইন ওষুধের বিরুদ্ধে ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে।
- অপারেশনাল শিথিলতা (Operational Failures): প্রাথমিক সাফল্যের পর নজরদারিতে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি এবং শহরাঞ্চলের অপরিচ্ছন্ন নর্দমা ও নির্মাণকাজে মশার বংশবৃদ্ধিকে উপেক্ষা করা।
৬. আরবান ম্যালেরিয়া স্কিম (১৯৭১) ও মডিফাইড প্ল্যান অফ অপারেশন (MPO, ১৯৭৭)
আরবান ম্যালেরিয়া স্কিম (Urban Malaria Scheme – 1971): দ্রুত নগরায়ণ, নিকাশি ব্যবস্থার অভাব এবং নির্মাণকাজের ফলে শহরগুলোতে Anopheles stephensi মশার দাপট বাড়ে। এর মোকাবিলায় ১৯৭১ সালে ইউএমএস চালু করা হয় যাতে শহরের জলাশয়, ওভারহেড জলের ট্যাঙ্ক ও নালায় বায়ো-লার্ভিসাইড এবং মশার লার্ভাখেকো মাছ ছাড়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
মডিফাইড প্ল্যান অফ অপারেশন (MPO – 1977): ১৯৭৬ সালের ম্যালেরিয়ার ব্যাপক প্রত্যাবর্তনের পর সরকার বাস্তবসম্মত কৌশল হিসেবে ১৯৭৭ সালে MPO চালু করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল:
- ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যু সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা।
- অসুস্থতার মাত্রা ও পরজীবীর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- কৃষি ও শিল্পোৎপাদনে ম্যালেরিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করা।
- গ্রামাঞ্চলে Drug Distribution Centres (DDC) এবং Fever Treatment Depots (FTD) তৈরি করে দ্রুত ওষুধ বিতরণ নিশ্চিত করা।
৭. ম্যালেরিয়া অ্যাকশন প্রোগ্রাম (MAP, ১৯৯৫) ও বর্ধিত ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প (EMCP)
১৯৯৪ সালে রাজস্থান, হরিয়ানা ও গুজরাটে ম্যালেরিয়ার ভয়াবহ মহামারী দেখা দিলে সরকার ১৯৯৫ সালে Malaria Action Programme (MAP) চালু করে। এই প্রকল্পে এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি অনুসারে দেশকে বিভক্ত করা হয়:
- উপজাতীয় এলাকা (Tribal Areas): দুর্গম ও ঘন জঙ্গলময় অঞ্চল যেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন।
- মহামারী প্রবণ এলাকা (Epidemic-prone Areas): বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত এলাকা।
- প্রজেক্ট এরিয়া (Project Areas): বাঁধ, সেচ খাল ও বৃহৎ শিল্পাঞ্চল যেখানে শ্রমিকদের ঘন সমাগম ঘটে।
- কীটনাশক প্রতিরোধী এলাকা (Insecticide-resistant Areas): যেসব অঞ্চলে প্রচলিত ডিডিটিতে মশা মারা যায় না।
Enhanced Malaria Control Project (EMCP – 1997): বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ থেকে ভারতের ৮টি রাজ্যের ১০০টি পিছিয়ে পড়া উপজাতীয় জেলায় এটি বাস্তবায়িত হয়। এতে তথ্যপ্রযুক্তি, রক্ত পরীক্ষার স্লাইড দ্রুত পরীক্ষা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
৮. জাতীয় ভেক্টর বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NVBDCP) ও এলিমিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক
২০০৩-০৪ সালে ম্যালেরিয়া কর্মসূচিকে অন্যান্য মশকবাহিত রোগের সাথে একীভূত করে জাতীয় ভেক্টর বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NVBDCP)-এর আওতায় আনা হয়। বর্তমানে এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত হয়। বিস্তারিত তথ্যের জন্য ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বোর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (NCVBDC) অফিশিয়াল পোর্টাল ভিজিট করতে পারেন।
National Framework for Malaria Elimination (NFME 2016–2030): ভারত সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে সম্পূর্ণ ম্যালেরিয়া দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি জেলাকে অ্যানুয়াল প্যারাসাইট ইনসিডেন্স (API) সূচক অনুযায়ী ৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে লক্ষ্যভিত্তিক কাজ চলছে:
- Category 0 (Prevention of Re-introduction): যেখানে শূন্য সংক্রমণ বজায় রাখা হচ্ছে।
- Category 1 (Elimination Phase): API < 1 (প্রতি ১০০০ জনে ১ জনের কম আক্রান্ত)।
- Category 2 (Pre-elimination Phase): API ১ থেকে ২-এর মধ্যে।
- Category 3 (Intensified Control Phase): API > ২ (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা)।
৯. আধুনিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রোটোকল (Diagnosis & Treatment)
সঠিক সময়ে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে ভারত সরকার সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নীতি অনুসরণ করে:
ক. রোগ নির্ণয় পদ্ধতি (Diagnostic Methods)
- ব্লাড স্মিয়ার মাইক্রোস্কোপি (Blood Smear Examination): গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি। থিক স্মিয়ার (Thick Smear) দ্বারা পরজীবীর উপস্থিতি এবং থিন স্মিয়ার (Thin Smear) দ্বারা প্রজাতির ধরন চিহ্নিত করা হয়।
- র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (RDT / Dipstick Test): ফিল্ড লেভেলে রক্ত পরীক্ষার কিট, যা মাত্র ১৫-২০ মিনিটে P. falciparum এবং P. vivax অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে পারে।
খ. ওষুধ প্রয়োগ ও চিকিৎসা নির্দেশিকা (Treatment Guidelines)
- প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স চিকিৎসা: ক্লোরোকুইন (Chloroquine) ৩ দিন এবং যকৃতে সুপ্ত হিপনোজয়েট দূর করে রিল্যাপ্স রুখতে প্রিমাকুইন (Primaquine) ১৪ দিন প্রদান করা হয়। (সতর্কতা: G6PD ঘাটতি থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে প্রিমাকুইন চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া আবশ্যক)।
- প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম চিকিৎসা: আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক কম্বিনেশন থেরাপি বা ACT (Artesunate + Sulfadoxine-Pyrimethamine) ৩ দিন এবং প্রথম দিনে সিঙ্গেল ডোজ প্রিমাকুইন প্রদান।
১০. মশক নিধন ও ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ কৌশল (Vector Management)
মশার জীবনচক্র ধ্বংস করা এবং মানুষের সাথে মশার সংস্পর্শ কমানোর জন্য সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা (Integrated Vector Management – IVM) প্রয়োগ করা হয়:
- লং লাস্টিং ইনসেক্টিসাইডাল নেট (LLIN): উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজাতীয় ও গ্রামীণ এলাকায় বিনামূল্যে দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণ। এটি ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
- ইনডোর রেসিডুয়াল স্প্রে (IRS): ঘরের দেওয়ালে সিন্থেটিক পাইরেথ্রয়েড (Synthetic Pyrethroids) স্প্রে করা।
- বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল (জৈবিক নিয়ন্ত্রণ): স্থির জলাশয়, নালা ও কুয়োতে লার্ভাখেকো মাছ যেমন গ্যাম্বুশিয়া (Gambusia affinis) এবং গাপ্পি (Poecilia reticulata) চাষ করা।
- উৎস হ্রাস ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা (Source Reduction): বাড়ির আশেপাশে জল জমতে না দেওয়া এবং প্রতি বছর ১ থেকে ৭ মে ‘জাতীয় ম্যালেরিয়া বিরোধী সপ্তাহ’ হিসেবে সচেতনতা প্রচার করা।
স্বাস্থ্য ও নার্সিং বিষয়ের অন্যান্য শিক্ষামূলক নোটস ও স্টাডি মেটেরিয়াল পড়তে আমাদের Educenters.in হোমপেজ ভিজিট করুন।
১১. সাধারণ প্রশ্নোত্তর (Frequently Asked Questions – FAQs)
প্রশ্ন ১: ভারতে জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NMCP) কবে শুরু হয়েছিল?
উত্তর: ভারত সরকার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম NMCP চালু করেছিল।
প্রশ্ন ২: কোন মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়?
উত্তর: সংক্রামিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস (Anopheles) মশার দংশনে ম্যালেরিয়া পরজীবী ছড়ায়।
প্রশ্ন ৩: সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া কোন পরজীবীর কারণে হয়?
উত্তর: Plasmodium falciparum নামক মারাত্মক পরজীবীর সংক্রমণের কারণে মস্তিষ্কে রক্ত সংবহন ব্যাহত হয়ে সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া সৃষ্টি হয়।
প্রশ্ন ৪: ম্যালেরিয়া নির্মূলের ক্ষেত্রে LLIN কী?
উত্তর: LLIN হলো Long-Lasting Insecticidal Nets বা বিশেষ প্রযুক্তিযুক্ত মশারি, যার সুতোয় কীটনাশক এমনভাবে মেশানো থাকে যা বারবার ধোয়ার পরেও ৩-৫ বছর মশা নিধনে কার্যকর থাকে।
