জনস্বাস্থ্যের কাজে ব্যাপৃত আন্তর্জাতিক জাতীয় সংস্থা গুলি
জনস্বাস্থ্যের কাজে ব্যাপৃত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থাগুলি: ইতিহাস, কাজ ও গুরুত্ব
একটি সুস্থ ও রোগমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পর্যায়ের একাধিক সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পুষ্টি সরবরাহ, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জরুরি সেবা প্রদানে এই সংস্থাগুলির অবদান অনস্বীকার্য। এই আর্টিকেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF), রেড ক্রস সহ জনস্বাস্থ্যের কাজে ব্যাপৃত প্রধান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংগঠনগুলির ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
💡 জ্ঞাতব্য: নার্সিং, কম্যুনিটি হেল্থ, প্যারামেডিকেল এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষার সাধারণ জ্ঞান (GK) অংশের জন্য এই সংস্থাগুলির প্রতিষ্ঠা সাল, সদর দপ্তর ও কার্যাবলী জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization – WHO)
১৯৪৫ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘ (UNO) গঠনের সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একটি অধীনস্থ সংস্থা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কনফারেন্সে এর প্রকৃত রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবশেষে ৭ই এপ্রিল, ১৯৪৮ সালে এর সংবিধান গৃহীত হয়। তাই প্রতি বছর ৭ই এপ্রিল ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ (World Health Day) হিসেবে পালিত হয়।
- সদর দপ্তর: জেনেভা (Geneva), সুইজারল্যান্ড।
- প্রধান কাজ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হলো পৃথিবীর বৃহত্তম আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা। এটি স্বাস্থ্যের ব্যাপক ও সদর্থক সংজ্ঞা প্রদান করেছে এবং বিশ্বজুড়ে মহামারী প্রতিরোধ, টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য নীতির তদারকি করে।
২. ইউনিসেফ (UNICEF – United Nations International Children’s Emergency Fund)
ইউনিসেফ ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির শিশুদের জরুরি স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রথম দিকে এটি কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে এর কার্যাবলী বিশ্বব্যাপী অনগ্রসর ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সম্প্রসারিত হয়।
- মূল কার্যালয়: নিউইয়র্ক (USA)। দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কার্যালয় নতুন দিল্লিতে অবস্থিত।
- প্রধান কাজ: মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান, বিশুদ্ধ জল সরবরাহ, স্কুল হেলথ ও সমাজকল্যাণ মূলক কাজে অগ্রাধিকার প্রদান করা। এছাড়া UNDP, FAO, UNESCO ও UNCTAD-এর সাথে যৌথভাবে বিভিন্ন দেশকে আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য দেয়।
৩. ইউ.এন.ডি.পি (UNDP – United Nations Development Programme)
ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- প্রধান কাজ: বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলিকে মানবসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও তার সঠিক ব্যবহারের জন্য আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য প্রদান করে থাকে।
৪. ফাও (FAO – Food and Agriculture Organization)
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) হলো জাতিসংঘের একটি অন্যতম সহায়ক সংস্থা, যা ১৯৪৫ সালে গঠিত হয়।
- সদর দপ্তর: রোম (Rome), ইতালি।
- প্রধান কাজ: খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য সংরক্ষণ, কৃষি ও খামার উন্নয়ন, বনাঞ্চল রক্ষা এবং মৎস্য চাষ উন্নতকরণের মাধ্যমে জনগণের পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
- স্মরণীয় তথ্য: বাঙালি ব্যক্তিত্ব প্রয়াত বিনয় রঞ্জন সেন বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৫. আই.এল.ও (ILO – International Labour Organization)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অফ নেশনসের সহযোগী সংস্থা হিসেবে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এটি জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত হয়।
- সদর দপ্তর: জেনেভা (Geneva), সুইজারল্যান্ড।
- প্রধান কাজ: বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার, উপযুক্ত পারিশ্রমিক, শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।
৬. বিশ্ব ব্যাংক (World Bank)
বিশ্ব ব্যাংক জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৪৪ সালে ব্র্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয়।
- সদর দপ্তর: ওয়াশিংটন ডি.সি (USA)।
- প্রধান কাজ: উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে স্যানিটেশন, জল সরবরাহ, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ, পরিবার কল্যাণ, শিক্ষা ও পরিকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ঋণ ও অনুদান প্রদান করা।
৭. ইউ.এস. এ. আই. ডি (USAID) ও টি.সি.এম (TCM)
USAID (United States Agency for International Development): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাটি ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, নার্সিং এডুকেশন, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্যানিটারি প্রকল্পে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
TCM (Technical Co-operation Mission): এটিও আমেরিকার একটি সরকারি সংস্থা, যা USAID-এর পরিপূরক সংস্থা হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একযোগে কাজ করে।
৮. বিশ্বখ্যাত বেসরকারি ও সমাজকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশনসমূহ
রকফেলার ফাউন্ডেশন (Rockefeller Foundation)
১৯১৩ সালে আমেরিকান ধনকুবের জন ডি. রকফেলার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার বিখ্যাত ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেল্থ’ এবং সিঙ্গুর (হুগলি) ও চেতলার গ্রামীণ ও নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় এই ফাউন্ডেশনের আর্থিক অবদান অপরিসীম।
ফোর্ড ফাউন্ডেশন (Ford Foundation)
আমেরিকান শিল্পপতি হেনরি ফোর্ড প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি ভারতে পরিবার কল্যাণ প্রকল্প এবং তামিলনাড়ুর গান্ধীগ্রামে ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
কেয়ার (CARE – Cooperative for Assistance and Relief Everywhere)
কেয়ার (CARE) একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা। ভারতের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে চালু থাকা বহুপ্রচলিত ‘স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম’ (School Feeding Programme)-এর সিংহভাগ পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তায় এদের বিশেষ অবদান রয়েছে।
৯. আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (International Red Cross)
সুইস নাগরিক হেনরি ডুনান্ট (Henry Dunant) ১৮৫৯ সালে ইতালির সলফোরিনোর যুদ্ধের ভয়াবহতায় আহত সৈন্যদের করুণ দশা দেখে ব্যথিত হন। তাঁর উদ্যোগে ১৮৬৩-৬৪ সালে জেনেভাতে প্রথম কনভেনশন আয়োজিত হয় এবং রেড ক্রস প্রতিষ্ঠিত হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এটি একটি অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ মানবিক প্রতিষ্ঠান।
- প্রধান কাজ: যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের সেবা, খাদ্য সরবরাহ, বন্দী বিনিময় এবং যুদ্ধরত শিবিরের সৈন্যদের চিঠিপত্র আদান-প্রদান। বর্তমান যুগে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, রক্তদান শিবির ও সাধারণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রেড ক্রস বিশ্বজুড়ে কাজ করে চলেছে।
উপসংহার
বিশ্বকে ব্যাধিমুক্ত রাখতে এবং বিশেষ করে অনগ্রসর মানবজাতির জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এই সমস্ত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তাদের ধারাবাহিক প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তার ফলেই পৃথিবী থেকে পোলিও ও গুটিবসন্তের মতো মারাত্মক রোগ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ ও পরীক্ষার স্টাডি মেটেরিয়াল পেতে আমাদের ওয়েবসাইট Educenters.in-এর সাথে যুক্ত থাকুন।
