Health Administration in India
Health Administration In india
Health Administration in India: ভারতের স্বাস্থ্য প্রশাসন ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা (Updated Guide)
যেকোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতিই পারে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। আর এই লক্ষ্য পূরণের জন্যই প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্য প্রশাসন। “Health Administration in India” বা ভারতের স্বাস্থ্য প্রশাসন ব্যবস্থা একটি বিশাল এবং বহুমুখী কাঠামো, যা কেন্দ্র থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। মেডিকেল, নার্সিং এবং ফার্মাকোলজির শিক্ষার্থীদের জন্য ভারতের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা (Health Planning) এবং প্রশাসন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই আর্টিকেলে আমরা ভারতের স্বাস্থ্য পরিকল্পনার ইতিহাস, ত্রি-স্তরীয় স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. ভারতের স্বাস্থ্য পরিকল্পনার ইতিহাস (History of Health Planning in India)
ভারতের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা মূলত জাতীয় আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতার আগে এবং পরে বিভিন্ন সময়ে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরির জন্য বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৪৬ সালের ভোর কমিটি (Bhore Committee)। এটিই ছিল ভারতের প্রথম সুসংগঠিত স্বাস্থ্য পরিকল্পনা সংক্রান্ত কমিটি, যা দেশের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন প্রদান করেছিল। পরবর্তীকালেও ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন কমিটি গঠন করেছে, যাদের মূল কাজ ছিল তৎকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পর্যালোচনা করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা সুপারিশ (Recommendations) প্রদান করা। এই কমিটিগুলোর রিপোর্টই ভারতের জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
২. ভারতের ত্রি-স্তরীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (Three-Tier System of Health Care Delivery)
ভারতের বিশাল জনসংখ্যার কাছে সঠিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। এই ত্রি-স্তরীয় ব্যবস্থাটি মূলত ১৯৭৫ সালের শ্রীবাস্তব কমিটির (Srivastav Committee) রিপোর্টের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
ক. প্রাথমিক স্তর (Primary / 1st Level)
এটি হলো গ্রামীণ মানুষের প্রথম চিকিৎসা কেন্দ্র। এর অধীনে রয়েছে:
-
সাব-সেন্টার বা উপ-কেন্দ্র (Subcenters): গ্রাম পর্যায়ে এটি কাজ করে। সাধারণত ৪ থেকে ৫টি গ্রামের জন্য একটি সাব-সেন্টার থাকে।
-
প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র (Primary Health Center – PHC): এটি ব্লক পর্যায়ে অবস্থিত। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০টি গ্রামের প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব থাকে একটি প্রাইমারি হেলথ সেন্টারের ওপর।
খ. দ্বিতীয় স্তর (Secondary / 2nd Level)
প্রাথমিক স্তরে যেসব রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাদের রেফার করে দ্বিতীয় স্তরে পাঠানো হয়। এর অধীনে রয়েছে:
-
গ্রামীণ হাসপাতাল (Rural Hospital): যা তালুক, তহসিল বা ব্লক পর্যায়ে থাকে।
-
কটেজ হাসপাতাল বা জেলা হাসপাতাল (District Hospital): যা সরাসরি জেলা পর্যায়ে পরিচালিত হয় এবং এতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সুবিধা থাকে।
গ. তৃতীয় স্তর (Tertiary / 3rd Level)
এটি হলো স্বাস্থ্যসেবার সর্বোচ্চ স্তর, যেখানে অতি উন্নত এবং স্পেশালাইজড চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
-
এর অধীনে রয়েছে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ (Medical College) এবং সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল (Specialist Hospital)। এখানে উন্নত গবেষণা এবং জটিল রোগের চিকিৎসা করা হয়।
৩. প্ল্যানিং কমিশন বা পরিকল্পনা কমিশন (Planning Commission)
ভারতের সম্পদ (যেমন- কাঁচামাল, মূলধন এবং মানব সম্পদ) মূল্যায়ন করে সেগুলোর সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহারের জন্য ১৯৫০ সালে ভারত সরকার ‘প্ল্যানিং কমিশন’ গঠন করে। ১৯৫৭ সালে এই কমিশনে একটি ‘পার্সপেক্টিভ প্ল্যানিং ডিভিশন’ যুক্ত করা হয়, যার কাজ ছিল আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করা।
এই কমিশনের নেতৃত্বে থাকতেন একজন চেয়ারম্যান এবং একজন ডেপুটি চেয়ারম্যানসহ ৫ জন সদস্য। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (Five-Year Plans) মাধ্যমে দেশের দ্রুত ও সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। পরবর্তীতে এই পরিকল্পনা প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralized) করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
৪. স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনা (Health Sector Planning)
যেহেতু মানব সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘স্বাস্থ্য’ একটি অপরিহার্য নিয়ামক, তাই প্ল্যানিং কমিশন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলোতে স্বাস্থ্য কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। পরিকল্পনার সুবিধার্থে স্বাস্থ্য খাতকে নিম্নলিখিত উপ-বিভাগে (Sub-sectors) ভাগ করা হয়েছে:
১. জল সরবরাহ এবং স্যানিটেশন (Water supply and sanitation): জনস্বাস্থ্যের প্রাথমিক শর্ত হলো পরিচ্ছন্নতা। ২. সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (Control of communicable diseases): মহামারী এবং ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধ করা। ৩. চিকিৎসা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা (Medical education, training, and research): দক্ষ ডাক্তার ও নার্স তৈরি করা। ৪. চিকিৎসা সেবা (Medical care): যার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, ডিসপেনসারি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ৫. জনস্বাস্থ্য পরিষেবা (Public health services): সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি। ৬. পরিবার পরিকল্পনা (Family planning): জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। ৭. দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা (Indigenous systems of medicine): আয়ুর্বেদ, যোগা বা হোমিওপ্যাথির মতো দেশীয় চিকিৎসার প্রসার।
৫. স্বাস্থ্য খাতের পরিচালনা ও বাস্তবায়ন
সময়ের সাথে সাথে মানুষের চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্য পরিকল্পনাগুলোর ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে একটি উন্নত সমন্বয় বজায় রাখার জন্য ১৯৬৫ সালে ভারত সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ব্যুরো অফ প্ল্যানিং’ (Bureau of Planning) গঠন করা হয়। এই ব্যুরোর প্রধান কাজ হলো জাতীয় স্বাস্থ্য পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো সংকলন করা। এই পরিকল্পনাগুলো পর্যায়ক্রমে কেন্দ্র, রাজ্য, জেলা, ব্লক এবং সবশেষে গ্রাম পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQs)
১. ভারতের ত্রি-স্তরীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কোন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি? এটি মূলত ১৯৭৫ সালের শ্রীবাস্তব কমিটি (Srivastav Committee)-এর রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
২. প্রাথমিক স্তরের স্বাস্থ্যসেবায় কী কী অন্তর্ভুক্ত থাকে? প্রাথমিক স্তরে গ্রাম পর্যায়ে সাব-সেন্টার (Subcenters) এবং ব্লক পর্যায়ে প্রাইমারি হেলথ সেন্টার (Primary Health Center বা PHC) অন্তর্ভুক্ত থাকে।
৩. ভারতের স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য কী? মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের মানব সম্পদের সঠিক ব্যবহার, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন জল সরবরাহ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।
৪. প্ল্যানিং কমিশন কবে গঠিত হয় এবং এর প্রধান কাজ কী ছিল? ১৯৫০ সালে প্ল্যানিং কমিশন গঠিত হয়। এর মূল কাজ ছিল দেশের সম্পদ মূল্যায়ন করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের সুষম অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
