📚 Education for all Empowering students since May 2020
📍 জাঙ্গীপাড়া, Hooghly
World Health Organization WHO history structure functions and Covid-19 controversy explained in Bengali

World Health Organization (WHO): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইতিহাস, গঠন এবং কার্যাবলি

THE WORLD HEALTH ORGANISATION


World Health Organization (WHO): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইতিহাস, গঠন এবং কার্যাবলি

বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে, তা হলো World Health Organization বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। এটি জাতিসংঘের (United Nations) একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যা আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রধান ভূমিকা পালন করে।

আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্ম ইতিহাস, সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো এবং বিশ্বজুড়ে এর কার্যাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা বিভিন্ন মেডিকেল কোর্স এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস (Birth of WHO)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর ১৯৪৫ সালে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ‘জাতিসংঘ’ বা United Nations (UNO) গঠিত হয়। এই সময় ব্রাজিল ও চীনের প্রতিনিধিরা প্রস্তাব দেন যে, আন্তর্জাতিক স্তরে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি আলাদা সংস্থা থাকা প্রয়োজন।

এরই ফলস্বরূপ, ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কে ৫১টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সদস্য দেশগুলোর সম্মতিক্রমে ১৯৪৮ সালের ৭ই এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় এবং WHO-এর জন্ম হয়।

এই ঐতিহাসিক দিনটি স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর ৭ই এপ্রিল বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ (World Health Day) পালন করা হয়। প্রতি বছর এই দিনে একটি বিশেষ ‘থিম’ (Theme) বেছে নেওয়া হয়, যা বিশ্বের বর্তমান কোনো বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যার ওপর জোর দেয়।

WHO-এর সংবিধান এবং স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা (Constitution of WHO)

WHO-এর সংবিধানের খসড়াটি একটি ‘টেকনিক্যাল প্রিপারেটরি কমিটি’ তৈরি করেছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সোশ্যাল মেডিসিনের পথিকৃৎ ডঃ রেনে স্যান্ড এবং কানাডিয়ান সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ ব্রক চিসহোম।

WHO-এর মূল উদ্দেশ্য হলো: “বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ স্তরের স্বাস্থ্য অর্জন করা।” এর সংবিধানে স্বাস্থ্যের যে বিখ্যাত সংজ্ঞাটি দেওয়া হয়েছে তা হলো:

“স্বাস্থ্য বলতে কেবল রোগ বা দুর্বলতার অনুপস্থিতি বোঝায় না, এটি হলো সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা।”

সংবিধানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো হলো:

১. জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য উপভোগ করা প্রতিটি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার।

২. বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা অনেকটাই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল।

৩. সরকারগুলোর দায়িত্ব হলো তাদের নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।

সাংগঠনিক কাঠামো (Organizational Structure of WHO)

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা (Geneva, Switzerland) শহরে WHO-এর প্রধান কার্যালয় বা হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। বর্তমানে এর সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯৪। এর সাংগঠনিক কাঠামো মূলত তিনটি প্রধান অঙ্গ নিয়ে গঠিত:

১. ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি (World Health Assembly): এটি হলো WHO-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা বা আইনসভা (পার্লামেন্টের মতো)। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এখানে অংশ নেন।

২. এক্সিকিউটিভ বোর্ড (Executive Board): এটি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কার্যকরী সংস্থা, যা অ্যাসেম্বলির নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে।

৩. সচিবালয় (Secretariat): এটি প্রশাসনিক অঙ্গ, যা ডিরেক্টর-জেনারেল (Director-General) এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক কর্মীদের নিয়ে গঠিত।

WHO-এর আঞ্চলিক কার্যালয় (WHO Regional Organizations)

বিশ্বের বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকার স্বাস্থ্যগত চাহিদাগুলো আলাদা। তাই সুষ্টুভাবে কাজ পরিচালনার জন্য WHO সারা বিশ্বকে ৬টি অঞ্চলে (Regions) ভাগ করেছে। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একটি করে রিজিওনাল অফিস রয়েছে। ভারতের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অধীনে।

নিচে WHO-এর ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের তালিকা দেওয়া হলো:

অঞ্চলের নাম (Region) সদর দপ্তর (Headquarters)
১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (South-East Asia – SEARO) নয়াদিল্লি, ভারত (New Delhi, India)
২. আফ্রিকা (Africa – AFRO) ব্রাজাভিলি, কঙ্গো (Brazzaville, Congo)
৩. আমেরিকা (Americas – PAHO/AMRO) ওয়াশিংটন ডি.সি., মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (Washington D.C., USA)
৪. ইউরোপ (Europe – EURO) কোপেনহেগেন, ডেনমার্ক (Copenhagen, Denmark)
৫. পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় (Eastern Mediterranean – EMRO) কায়রো, মিশর (Cairo, Egypt)
৬. পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় (Western Pacific – WPRO) ম্যানিলা, ফিলিপাইন (Manila, Philippines)

প্রধান কার্যাবলি ও বিভাগ (Functions & Divisions)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। যেমন—মহামারী নিয়ন্ত্রণ, টিকাকরণ কর্মসূচি (যেমন- পোলিও বা কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন), মা ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়ন, এবং নিরাপদ পানীয় জল ও পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করা। এই কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে করার জন্য WHO-এর অধীনে বেশ কিছু বিশেষ বিভাগ রয়েছে, যেমন:

  • সংক্রামক রোগ বিভাগ (Division of Communicable Diseases)

  • অসংক্রামক রোগ বিভাগ (Division of Non-communicable Diseases)

  • মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ (Division of Mental Health)

  • পরিবার স্বাস্থ্য বিভাগ (Division of Family Health)

  • পরিবেশগত স্বাস্থ্য বিভাগ (Division of Environmental Health)

কোভিড-১৯ মহামারী এবং WHO-কে ঘিরে বিতর্ক (Controversy during COVID-19 Pandemic)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যুগে যুগে পোলিও, গুটিবসন্ত (Smallpox) নির্মূলে দারুণ সাফল্য পেলেও, ২০১৯-২০২০ সালের করোনা বা কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারীর সময় সংস্থাটিকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়। এর প্রধান কারণগুলো ছিল:

  • সতর্কতা জারিতে বিলম্ব: চীনের উহানে ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়ানোর পর, বিষয়টিকে ‘Public Health Emergency’ এবং ‘বিশ্বব্যাপী মহামারী’ (Pandemic) হিসেবে ঘোষণা করতে WHO কিছুটা দেরি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

  • চীনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ: অনেক পশ্চিমা দেশের (বিশেষ করে আমেরিকার) অভিযোগ ছিল যে, ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ও ভয়াবহতা সম্পর্কে চীন যে তথ্য দিয়েছিল, WHO তা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছিল।

  • মাস্ক এবং গাইডলাইন নিয়ে বিভ্রান্তি: মহামারীর শুরুর দিকে সুস্থ ও সাধারণ মানুষের মাস্ক পরা উচিত কি না বা ভাইরাসটি বায়ুবাহিত (Airborne) কি না, তা নিয়ে WHO-এর প্রাথমিক গাইডলাইনে কিছু অস্পষ্টতা ছিল, যা মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

  • উৎস সন্ধানে তদন্ত (Origin Tracing): করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি কি কোনো প্রাণী থেকে প্রাকৃতিকভাবে ঘটেছে নাকি উহানের ল্যাব থেকে (Lab-leak theory), তা নিয়ে WHO-এর তদন্তকারী দলের রিপোর্ট অনেক দেশের কাছেই অসম্পূর্ণ মনে হয়েছিল।

  • তহবিল বাতিলের হুমকি: এই বিতর্কগুলোর জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন) সাময়িকভাবে WHO-কে দেওয়া তাদের বিপুল পরিমাণ তহবিল বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল, যদিও পরবর্তী সময়ে তা পুনরায় চালু করা হয়।

উপসংহার

কিছু বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সামগ্রিক ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে ওষুধ সরবরাহ, টিকাকরণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে WHO আজও বিশ্ববাসীর প্রধান ভরসা।

আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ভূমিকা অপরিসীম। গুটিবসন্ত (Smallpox) নির্মূল করা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের করোনা মহামারীর মতো সংকট মোকাবিলায় WHO বিশ্ববাসীকে সঠিক পথ দেখিয়েছে।

মেডিকেল, নার্সিং এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ স্টাডি ম্যাটেরিয়ালের জন্য নিয়মিত Educenters.in ফলো করুন।

Leave a Reply